
দরজায় কড়া নাড়ছে শীত। হেমন্তের শুরুতেই গ্রামীণ প্রকৃতিতে বইছে শীতের আগমনী বার্তা। সেই সঙ্গে ঝিনাইদহের প্রকৃতিতেও লেগেছে হেমন্তের ছোঁয়া। শীত আসার আগেই জেলার গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন খেজুর গাছের পরিচর্যা ও রস সংগ্রহের প্রস্তুতিতে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন খেজুর গাছ প্রস্তুতের কাজ চলছে পুরোদমে। রাস্তার ধারে কিংবা জমির আইলে থাকা গাছগুলোর মাথা পরিষ্কার করতে ভোর থেকেই গাছিরা হাতে নিচ্ছেন ঠুঙ্গি, বাইলধারা, দড়ি ও ধারালো দা। মাথা পরিষ্কারের পর গাছগুলোকে দুই সপ্তাহের বিশ্রাম দেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় রস সংগ্রহের মৌসুম।
সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের গাছি আনিছুর রহমান বলেন,
‘কার্তিক মাসের শুরু থেকেই আমরা খেজুর গাছ তোলার কাজ শুরু করি। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে রস পাওয়া যাবে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনে দেশের অন্যতম জেলা। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ু খেজুর গাছের জন্য বেশ উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছর এখান থেকে ৮০০ থেকে ৮৫০ টন খেজুর গুড় উৎপাদিত হয়।
গাছিরা জানান, গাছের সংখ্যা কমে গেলেও তাদের রস সংগ্রহের আগ্রহ কমেনি। মজিবার রহমান নামে এক গাছি বলেন,
‘প্রায় ৪৫ বছর ধরে খেজুর গাছ কাটি। রস ও গুড় বিক্রি করে ভালো আয় হয়। তবে এখন নতুন গাছি পাওয়া যায় না। গাছ কমে যাচ্ছে, গাছিও হারিয়ে যাচ্ছে। এভাবে চললে ঝিনাইদহের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে জেলায় খেজুর গাছের সংখ্যা ১ লাখ ৪২ হাজার ২৩৫টি। এর মধ্যে রস আহরণযোগ্য গাছ রয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬০টি। বাকি গাছের কিছু চারা এবং কিছু থেকে রস সংগ্রহ করা হয় না। প্রতিবছর জেলায় প্রায় ৪৮ লাখ ১৪ হাজার লিটার খেজুর রস এবং ৮৭২ মেট্রিক টন খেজুর গুড় উৎপাদন হয়।
জেলার মধ্যে কোটচাঁদপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি—৪৭ হাজার ৮৫৩টি খেজুর গাছ রয়েছে। এখানকার গাছি আনজের বিশ্বাস বলেন,
‘খেজুর গুড়ের স্বাদ অনন্য। শীত এলেই শহর-গ্রামের মানুষ আমাদের কাছ থেকে রস ও গুড় নিতে আসে। এটা শুধু গ্রামের নয়, দেশের ঐতিহ্য।’
সদর উপজেলার বারকোদালিয়া গ্রামের গৃহবধূ আছিয়া বেগম বলেন,
‘আগে রস অনেক বেশি হতো, এখন গাছ কমে গেছে। তবে আমরা এখনো চেষ্টা করছি। রস, গুড় আর পাটালি বিক্রি করে এ সময়টা আমাদের বাড়তি আয় হয়।’
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন,
‘নিরাপদ উপায়ে খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় উৎপাদনের জন্য গাছিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। গত বছর অনেক গাছিকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, এ বছরও তা অব্যাহত থাকবে। এ মৌসুমে আমাদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৯০০ মেট্রিক টন।’
সবমিলিয়ে শীতের আগমনী হাওয়ার সঙ্গে ঝিনাইদহে আবারও প্রাণ ফিরে পাচ্ছে খেজুর রস ও গুড়ের ঐতিহ্য।